বাদশাহ আলমগীর-
কুমারে তাঁহার পড়াইত এক মৌলভী দিল্লীর।
একদা প্রভাতে গিয়া
দেখেন বাদশাহ- শাহজাদা এক পাত্র হস্তে নিয়া
ঢালিতেছে বারি গুরুর চরণে
পুলকিত হৃদে আনত-নয়নে,
শিক্ষক শুধু নিজ হাত দিয়া নিজেরি পায়ের ধুলি
ধুয়ে মুছে সব করিছেন সাফ্ সঞ্চারি অঙ্গুলি।
‘শিক্ষকের মর্যাদা’ শিরোনামের এই কবিতাটি জানেন
না, এমন পাঠক বিরল। কবিতাটির রচয়িতা কবি কাজী কাদের নেওয়াজ । কবিতাটি ছোটকালে অনেক
পড়েছি।
কবিতার গল্পটি এরকম- দিল্লীর বাদশাহ আলমগীরের
পুত্রকে পড়ানোর দায়িত্ব ছিল একজন মৌলভীর ওপরে। একদিন বাদশাহ দেখতে গেলেন 'পুত্র কেমন
শিক্ষা লাভ করছে?' দেখলেন, বাদশাহ-পুত্র শিক্ষকের চরণে পানি ঢালছে। শিক্ষক তার চরণ
ধুয়ে মুছে সাফ করছেন নিজ হাতে। বাদশাহকে দেখে শিক্ষক ভাবলেন, দিল্লীপতির পুত্রের হাতে
সেবা নিয়েছি - আজ আর তার নিস্তার নেই। কিন্তু হঠাৎ করেই শিক্ষকের মনে হলো :
‘শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার/দিল্লীর পতি সে তো
কোন ছার,/ভয় করি না'ক, ধারি না'ক ধার, মনে আছে মোর বল/বাদশাহ শুধালে শাস্ত্রের কথা
শুনাব অনর্গল।’
তা আর শোনাতে হয়নি । বরং বাদশাহ তাকে অনেক বড়
সম্মানে ভূষিত করেছেন। বাদশাহ-পুত্র শিক্ষাগুরুর চরণে পানি ঢেলেছে, কিন্তু নিজ হাতে
চরণ ধুয়ে দেয়নি বলে বাদশাহ কষ্ট পেয়েছেন। শিক্ষক উচ্ছ্বাসভরে বলেছেন, ‘আজ হতে চির-উন্নত
হলো শিক্ষাগুরুর শির / সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ আলমগীর।’
স্বভাবতই শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর। একজন শিক্ষার্থীর
প্রকৃত মানুষরূপে গড়ে ওঠার পেছনে বাবা-মার চেয়ে শিক্ষকের অবদান কোনো অংশে কম নয়। মহান
আল্লাহতায়ালাও শিক্ষকদের আলাদা মর্যাদা ও সম্মান দান করেছেন।
মহানবী (সা.) যে ঐশী জ্ঞান অর্জন করেছেন, সে
জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি মানবজাতিকে সৃষ্টিকর্তা, মানুষ ও প্রকৃতির পারস্পরিক
সম্পর্কের নীতিমালা শিক্ষা দান করেছেন। তিনি নিজেই এ পরিচয় তুলে ধরে ঘোষণা করেছেন-
'শিক্ষক হিসেবে আমি প্রেরিত হয়েছি (ইবনু মাজাহ :২২৫)।'
আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, 'পড়, তোমার প্রতিপালকের
নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন একবিন্দু জমাট রক্ত থেকে। পড়,
আর তোমার প্রতিপালক পরম সম্মানিত। যিনি কলমের দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে
শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানত না (আলাক, ১-৫)।
একজন প্রাজ্ঞ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সত্যিকারভাবে
শিক্ষিত শিক্ষক সমাজ বদলে একটি বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন। আদর্শ শিক্ষকই শুধু আদর্শ
সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করতে পারেন। এ জন্যই শিক্ষকতাকে অপরাপর পেশার মানদণ্ডে পরিমাপ
করা যায় না বলে অনাদিকাল থেকে এটি একটি সুমহান পেশা হিসেবে সমাজ-সংসারে পরিগণিত। কারণ
জ্ঞানই মানুষের যথার্থ শক্তি ও মুক্তির পথনির্দেশ দিতে পারে।
এ মর্মে নবী (সা.) ইরশাদ করেন, 'দুই ব্যক্তি
ব্যতীত অন্য কারও পদ-গৌরব লোভনীয় নয়। তা হলো- ১. ধনাঢ্য ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ
দান করেছেন এবং তা সৎপথে ব্যয় করার ক্ষমতা দিয়েছেন; ২. ওই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ বিদ্যা
দান করেছেন এবং সে অনুসারে সে কাজ করে ও অপরকে শিক্ষা দেয় (বুখারি :৭১)।
শিক্ষা অনুযায়ী মানব চরিত্র ও কর্মের সমন্বয়
সাধনই হচ্ছে রাসুলের (সা.) তাগিদ। নিজে শিক্ষা অর্জন করার পরক্ষণেই অপরকে সেই শিক্ষায়
শিক্ষিত ও চরিত্র গঠন করার দায়িত্বও শিক্ষকের। রাসুল (সা.) বলেন- 'আল্লাহর পরে, রাসুলের
পরে ওই ব্যক্তি সর্বাপেক্ষা মহানুভব, যে বিদ্যার্জন করে ও পরে তা প্রচার করে (বুখারি
:৪৬৩৯)।
সুতরাং যার থেকে জ্ঞান অর্জন করা হয়, তিনিই আমাদের
শিক্ষক। শিক্ষকের মর্যাদায় ইসলামের বক্তব্য সুস্পষ্ট।
বর্তমান সমাজে শিক্ষকদের মর্যাদার বিষয়টি কিভাবে দেখা হয় বা মূল্যায়ন করা হয়?







0 Comments:
Post a Comment